সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

road-to-chennai.jpg

গন্তব্য চেন্নাই বাংলাদেশ থেকে কলকাতা, আমার দেশ আমার মা

বিদেশ আসলে তবেই বোঝা যায় নিজের দেশ, মা ও মাটি কতটা আপণ। মা তার সন্তানকে যেভাবে বুকে আগলে রেখে আদরে আদরে বড় করে তোলে মাতৃভূমিও তাই করে। মন আজ বড়ই আকুল হয়ে দেশে ফিরে যেতে চায়।

২৫ মে, যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছি আমি। আমার সাথে আরো ৬৭ জন সহপাঠী ও ২ জন শ্রদ্ধেয় স্যার ডা: ইমরান ও ডা: পারভেজ আছেন। ভেটেরিনারি শিক্ষায় ইন্টার্ণশীপের জন্য আমরাই দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যারা প্রাণি চিকিৎসার উপর বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ভারত আসি।

যশোরের বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় রাস্তাটার নাম ছিল যশোর রোর্ড। এই রোর্ড দিয়েই আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে ছুটেছে কলকাতার উদ্দেশ্যে। দুই পাশে ঘন গাছপালায় আচ্ছাদিত গ্রাম। যেমনটা আমি চট্টগ্রামে দেখেছিলাম। এই রোর্ডটার পাশেই হঠাৎ চোখে পড়েছিল আমাদের ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার। রাস্তার পাশে প্রচুর বাংলা লেখার ছড়াছড়ি। রাস্তাটি খুব সরু। কলকাতায় প্রবেশের পরও প্রশস্ত রাস্তা চোখে পড়েনি। তবে এখানে ট্রাফিক জ্যাম নেই। জ্যামের পরিবর্তে ট্রাফিকের সংকেত আছে। সংকেত পড়া মাত্রই গাড়িগুলো থেমে থাকে। ১-২ মিনিট থামার পর আবার চলতে থাকে।

প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘন্টা যাত্রার পর আমরা কলকাতার মারকুইজ স্ট্রীটে পৌঁছাই। সেখানে রাত কাটানোর জন্য হোস্টেলে উঠি। বিকেলে যে যেদিকে খুশি ঘুরতে বেড়িয়েছি। কলকাতার মানুষগুলো শরীরের গঠনগত দিক দিয়ে আমাদের দেশের মানুষের মতই। তবে মনের দিক দিয়ে আমাদের মত না। এরা একটু সুযোগ পেলেই ঠকানোর চেষ্টা করে! রাস্তার ট্যাক্সি ক্যাব চালক থেকে প্রায় সকলেই ঠকানোর জন্য মনে হয় তাকিয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি ঠকায় মোবাইল সিম বিক্রেতারা।

ভারতীয় মিউজিয়ামের সামনে থেকে সময়ের অভাবে ফিরে আসতে হয়েছিল। ভারত বুঝি তার দেশের নিদর্শন বহির্বিশ্বে তুলে ধরতে গোমড়া মুখো। তাই হয়তো জাদুঘরে প্রবেশমূল্য বিদেশীদের কাছে ১৫০ রুপি চায়। সাথে যদি ক্যামেরা থাকে তবে আরো ৫০ রুপি! যেখানে ভারতীয়রা মাত্র ১০ রুপিতেই প্রবেশের সুযোগ পায়। আমার বন্ধুদের মুখে শুনেছি মিউজিয়ামটি অনেক সুন্দর। কলকাতায় দেখার মত অনেক কিছুই আছে। ভিক্টোরিয়া পার্ক, সাইন্স সিটি, ইডেন গার্ডেন, হাওড়া ব্রীজ ইত্যাদি। সহপাঠীদের বিভিন্ন জন বিভিন্নটা দেখেছে। তবে সবাই এক বাক্যে সাইন্স সিটির গুণকীর্তন করেছে।

২৬ তারিখ কলকাতা ছাড়তে ছতরাগাছি ট্রেন স্টেশনে পৌঁছাই। সন্ধ্যা ৭ টায় চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে ছতরাগাছি - ২২৮০৭ নম্বর ট্রেনটি ছেড়েছে। এসি ট্রেন, গতি ভাল কিন্তু একটু পর পর থেমে থাকে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের ৪-৫ ঘন্টা পর গন্তব্যে পৌঁছাবে।

কলকাতার ঠকানো, খিটখিটে মেজাজের লোকদের ভীড়ে মনটা বড়ই ভারাক্রান্ত ছিল। দেশের কথা, প্রিয়জন, প্রিয় ক্যাম্পাস সব মনে পড়েছে। কিন্তু ছতরাগাছি ট্রেনটি ভারাক্রান্ত মনের ক্ষত কিছুটা কমিয়েছে।

ট্রেনের ১০ নম্বর বগির ৬ নম্বর সিটে শুয়ে শুয়ে গত কয়েক ঘন্টার স্মৃতিচারণ করছি। আমার পাশে আছে সোহেল হুজুর, কায়সার, মাহি, ওয়াসিফ। প্রচুর আনন্দ করি আমরা। কিছুক্ষণ পর পর অন্যান্য কামড়ায় যাই। সেখানে দেখি ভারতীয়দের সাথে আমার সহপাঠীরা বিভিন্ন গল্প, গান, খেলা আর আড্ডায় মেতেছে। ট্রেনের ভারতীয়রা খুবই মিশুক। ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকালে সারি সারি তালগাছ চোখে পড়ে। একজন জানিয়েছেন তাল থেকে প্রচুর তারু বানাবে এরা। বিস্তৃত ফাঁকা মাঠ, মাঠের পর অল্প কয়েকটা বাড়ি। মাঠে প্রচুর পাখির দেখা মেলে। চড়ে বেড়ায় গরু, মহিষ। দেখে মনেই হয় না এদেশের জনসংখ্যা ১২০ কোটিরও অধিক। ইঞ্জিন রুমের পাশে নামাজের জন্য ছোট্ট একটি রুম আছে। আমাদের একজন নামাজে গিয়ে সেখানে ভুলে মোবাইল ফোন রেখে আসে। অতঃপর তা ট্রেনে কর্তব্যরত এক ব্যক্তির দৃষ্টিপট প্রাপ্তি ও ফেরত দিয়ে যাওয়া সত্যিই অবাক করেছে আমায়!

কলকাতা আর এই ট্রেন! মনে হল দুইটা ভিন্ন গ্রহ। আসলে একটি দেশের একটি শহর দিয়ে পুরো দেশকে চেনা যায় না। ট্রেন চলছে গন্তব্যের দিকে। জানা-অজানা বিভিন্ন নদীর উপর দিয়ে। এখন মধ্যরাত্রি। প্রায় সকলেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। আমি ভাবছি আমার দেশের কথা, মা বাবা ও ভাই বোনের কথা। সুখ, শান্তি ভালবাসা সবতো ঐদেশেই পেয়েছি। এদেশে নয়।

বিদেশ আসলে তবেই বোঝা যায় নিজের দেশ, মা ও মাটি কতটা আপণ। মা তার সন্তানকে যেভাবে বুকে আগলে রেখে আদরে আদরে বড় করে তোলে মাতৃভূমিও তাই করে। মন আজ বড়ই আকুল হয়ে দেশে ফিরে যেতে চায়। মনকে বোঝাই এইতো আর ক'টা দিন। তারপর ক্লিনিক্যাল ট্রেনিং শেষ করেই দেশের প্রাণি, পরিবেশ তথা মানুষের সেবা করবে। পড়াশোনাতো দেশের স্বার্থেই করছি। তবে খুব শীঘ্রই যদি আমাদের দেশেও উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু হত। তবে আর এদেশে আসতে হত না।

লেখক: ইন্টার্ণশীপ শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে ইন্টার্ণশীপের আওতায় ভারতে অবস্থানরত)।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

india, travel, internship, student, life, train, friends, parents, chennai