সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

bb.jpg

পাহাড়ের তারা বুকিত বিনতাং: নাইট আউট এট কুয়ালা লামপুর

পাহাড় ঘেরা মালয়েশিয়ার কুয়ালা লামপুরের বুকিত বিনতাং পাহাড়ের মধ্যে তারার মতই সবসময় জ্বলজ্বল করে। শপিং মল, হোটেল, বার, নাইট ক্লাবের সিটি বুকিট বিনতান।

আমি যে রেস্তোরায় কাজ করি সেখানে সোমবার সাপ্তাহিক ছুটি। সেই ছুটির দিনের আগের রাতে আর ফ্ল্যাটে ফিরে যাই না। এক রাত, এক দিনের জন্য গায়েব হয়ে যাই। কোথায় কোথায় যাই তার কোন ঠিক নাই। এক রবিবার রাত আটটার সময়, আরও আড়াই ঘন্টা বাকী রেস্টুরেন্ট বন্ধ হতে। সন্ধার পর থেকেই আমার কেমন যেন মাথা খারাপের মত অবস্থা হয়ে গেল। সময় যেন কাটছেই না। কখন বের হব?অস্থিরতার এক পর্যায়ে বসকে গিয়ে বললাম,
: বস, আমাকে আজকে এখন ছুটি দেয়া যায়?
: কেন?
: আমার কেমন পাগল-পাগল লাগছে।
: কী?....তুমি কি ড্রিংকস করেছ?
: না… না..।

আমার বস প্রায় আমার বয়সী। সরল চেহারার, নাদুস-নুদুস চাইনীজ। কাজের বাইরে তার সাথে আমার আলাপ-আলোচনা বন্ধুর মত। সে কিছুটা হলেও আমার ব্যাপার-স্যাপার বোঝে। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে, মুখে ‘আ.ড়..ড়…' (ভাবনার সময় সে এই জাতীয় শব্দ করে) জাতীয় শব্দ করে বলল, ‘ওকে, নেভার মাইন্ড… ইউ ক্যান গো ব্যাক।’ আমি ল্যাপটপের ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে, চার্জার প্লাগ থেকে ফোন পকেটে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেলাম।

কুয়ালা লামপুরের বুকিত বিনতাং এলাকাটি নাকি রাতে ঘুমায় না। সেটি কিভাবে জেগে থাকে সেটি আমার দেখা দরকার। গুগল সার্চ দিয়ে বের করলাম চায়না টাউনে এক রাতের জন্য কম ভাড়ায় হোটেলে রুম পাওয়া যায়। সিদ্ধান্ত নিতে নিতে এগারটা বেজে গেল। বাস স্টপে গিয়ে দেখি বাস নেই। রাত এগারটার পর মালয়েশিয়াতে চলাচল খুব ব্যয়বহুল এবং অসুবিধাজনক। রাত এগারটার পরে সব বাস, ট্রেন (এলআরটি সহ) সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। একমাত্র উপায় ট্যাক্সি ক্যাব। বারটার পর আবার মিটারের দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়।

মালয়েশিয়ার ক্যাব চালকদের অনেক কুখ্যাতি আছে। বিশেষ করে তামিলদের। তামিল চালকরা নাকি যখন রাতে ক্যাব নিয়ে বের হয় তখন তাদের চোখ হায়েনার মত জ্বল জ্বল করতে থাকে। মুখে দাঁত বের করা হাসি। তাদের হাসির কারণ রাতে বিনা বাঁধায় যাত্রীর ঘাড়ে কামড় বসিয়ে রক্ত পান করতে পারবে। যদিও এখন পর্যন্ত আমি কোন খারাপ তামিল পাইনি। তাদের চালচলন একটু রুক্ষ কিন্তু আমি যে কয়জন তামিলদের খুব কাছে থেকে দেখেছি তারা খুবই কর্মঠ এবং ভাল ইংরেজি বলে।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী বেশ কিছু হায়েনাকে পাশ কাটিয়ে এক মুসলিম, মালয়েশিয়ান ক্যাব চালক পেলাম। ড্রাইভারের মুখে দাঁড়ি, মাথায় টুপি। অধিকাংশ অরিজিনাল মালয়েশিয়ান মুসলিমরা খুবই ভাল মানুষ হয়। আমি বিনা দ্বিধায় গাড়ির ভিতর সামনের সিটে গিয়ে বসে বললাম,

: আমি বুকিত বিনতাং যাব। ফিক্সড ভাড়া কত?
: পঞ্চাশ রিংগিত।
: এটা অনেক বেশি হয়ে গেল। দামানসারা থেকে তো এত ভাড়া না।
: এখন তো মধ্যরাত। মধ্যরাতে ভাড়া বেশি।
: তুমি বিশ রিংগিত যাবে?

সে কিছুক্ষণ চুপকরে থেকে, সাইড মিররে বাইরে আশে পাশে তাকিয়ে বলল, ‘উমম... ঠিক আছে।’

কিং প্যালেসের পাশ দিয়ে ট্যাক্সি চলল কুয়ালা লামপুর। মধ্যরাত। ডানে-বায়ে তারার মত লাইটগুলো জ্বল জ্বল করছে। মালয়েশিয়ান ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সাথে আমি সবসময় যে ফাজলামিটা করে থাকি সেটা তার সাথেও শুরু করলাম।

: তুমি আমাকে বুকিত বিনতাং ‘---’ তে নামিয়ে দিবে।
: ঠিক আছে।
: আমি কিন্তু যাওয়ার রাস্তা কিছুই চিনি না।
: সমস্যা নেই। আমি তোমাকে জায়গামত নামিয়ে দেব।
: আমি শুনেছি কে.এল (কুয়ালা লামপুর) এর ট্যাক্সি ক্যাব ড্রাইভাররা নাকি খুব ডেঞ্জারাস।
: কেমন?
: তারা নাকি রাতে প্যাসেঞ্জারদের সব কিছু ছিনতাই করে রেখে জঙ্গলের মধ্যে নামিয়ে দেয়।
: কে বলেছে তোমাকে?
: সবাই বলে। আমার ব্যাগে একটা ল্যাপটপ আছে। পকেটে স্মার্ট ফোন আছে। মানি ব্যাগে পাঁচশ রিংগিতের মত আছে। তুমি চাইলে সব নিয়ে নিতে পার কিন্তু আমাকে কোন জঙ্গলে নিয়ে যেও না। এত রাতে জঙ্গলে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না।’

ট্যাক্সি ড্রাইভার বাঁ দিকের লেনে সরে এসে, গাড়ির স্পিড কমিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
: তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
: কেন?
: তুমি অযথাই ভয় পাচ্ছ। আমি একজন মুসলিম। আমি কখনোই অন্যায় কাজ করতে পারি না। তোমার কিছু হবে না।

আমার আগে থেকেই ধারণা ছিল সে একজন সৎ মুসলিম। আমার কথা শোনার পর তার ভিতরে মনে হয় সেটা প্রমাণ করার রোখ চেপে গেল। মালয়েশিয়াতে বিল্ডিংয়ে বিল্ডিংয়ে সাইনবোর্ডে ঠিকানা লেখা থাকে না। নির্দ্দিষ্ট বাড়ি খুজে বের করা খুবই কষ্ট সাধ্য। ড্রাইভার অনেক ঘুরে ঘুরে, প্রায় পনের মিনিট বেশি সময় লাগিয়ে আমাকে নির্দ্দিষ্ট জায়গায় নামিয়ে দিল। আমি বললাম,
: ভাড়া কী বাড়িয়ে দিতে হবে?
: না। বিশ রিংগিত দিবে।
: কিন্তু তোমার তো অনেক সময় নষ্ট হয়েছে।
: কিছু হবে না। আমি এখন আমার ওয়াইফকে বাড়ি নিয়ে যাব। ওর কাজ শেষ। এখানে আসতেই হত।
: থ্যাংকয়্যু। তুমি অনেক ভাল মানুষ। তোমার নাম কী?
: ড্যাশ বোর্ডের আইডি কার্ডে লেখা আছে।
: জা—হের। ওকে জাহের, ভাল থেকো। হয়তবা আবার কোন এক মধ্যরাতে তোমার সাথে দেখা হয়ে যাবে, এই বুকিত বিনতাংয়ে।

বুকিত মানে পাহাড় আর বিনতাং মানে তারা। বুকিত বিনতাং মানে পাহাড়ের তারা। পাহাড় ঘেরা মালয়েশিয়ার কুয়ালা লামপুরের বুকিত বিনতাং পাহাড়ের মধ্যে তারার মতই সবসময় জ্বলজ্বল করে। শপিং মল, হোটেল, বার, নাইট ক্লাবের সিটি বুকিট বিনতান। রাতে সব শপিং মলে তালা। বিশাল বিশাল গেটের সামনে গোমরা মুখে মিয়ানমার আর নেপালি সিকিউরিটি গার্ডরা ঘোরাঘুরি করছে। কিন্তু আর সব জায়গায় উৎসবের আমেজ। বার, ক্লাব, রাস্তাঘাট সব জায়গায় মানুষের ঢল। মোবাইল শপে নানারকম খাবার বিক্রি হচ্ছে। রাস্তার পাশে কয়েকটা ছেলে মেয়ে মিলে ছোট-খাট কনসার্টের মত করছে। এক্যুস্টিক গিটার, ড্রামসের সাথে চলছে চাইনিজ গান। পাশাপাশি দু:স্থদের নামে রিংগিত তোলা। তরুণ-তরুণীরা ভিড় করে সেই গান শুনছে। তাদের মধ্যে মালয়েশিয়ান ছেলে-মেয়েও আছে। মাথায় স্কার্ফ পরা মেয়েরা স্টিক কাবাব খাচ্ছে। চাইনিজদের অবাধ সংস্কৃতিতে মুসলিমরা মিশে যাচ্ছে।

বুকিত বিনতাংয়ের একটা অংশ এরাবিয়ানদের দখলে। মিসরীয়, ইরাক, ইরানীরা তাদের গার্লফেন্ড-ওয়াইফ নিয়ে সব রাতে বের হয়। ছেলেদের থুতনিতে স্টাইলিশ দাঁড়ি, চোখে সুরমার মত আই লাইনার। মেয়েরা নানা স্টাইলের বোরখা আর হিজাব পড়ে বের হয়েছে। এরাবিয়ান মানেই সিসা বার। সিসা বারে বসে ‘ভুড়-ভুড়’ করে ধোয়া ছাড়ছে আর সামনেই ড্রিংক্স বারে চলছে এরাবিয়ান মেয়েদের অর্ধ নগ্ন নাচ। অটোম্যাটিক মেশিন থেকে কয়েন দিয়ে সফট ড্রিংকস নিতে গিয়ে এক নেপালি সিকিউরিটি গার্ডের সাথে পরিচয় হল। অধিকাংশ নেপালি, নেপালি ভাষা আর হিন্দি ছাড়া অন্য কোন ভাষা ঠিকমত জানে না। মালয়েশিয়ান ভাষাও না, ইংরেজিও না। সেজন্য আমার মত অল্প হিন্দি জানা লোক পেলেও তারা খুব সাচ্ছন্দ বোধ করে। গল্প করতে চায়। কথায় কথায় কম বয়সী নেপালি সিকিউরিটি গার্ড ছেলেটি আমাকে বলল,
: আচ্ছা, তোমাদের ধর্মে কী এই সব অশ্লীলতা, টাকা ওড়ানো, এগুলি সাপোর্ট করে?
: কখনোই না।
: তাহলে এরাবিয়ানরা যে এইসব কর্মকান্ড করছে?
: তারা ভাল নয়, খারাপ মুসলিম। সে জন্যই তো দেখ না তাদের উপর কী অভিশাপ এসে পড়ছে।
: ও। তুমি কী ভাল মুসলিম না-কি খারাপ মুসলিম।
: আমি এখন মুসলিম হয়ে লজ্জিত বোধ করছি।
: মানে?
: মানে জানি না।

পৃথিবীতে মুসলিমদের প্রতি অমুসলিমদের অনেক কৌতুহল। সেই কৌতুহল থেকে প্রায়ই অনেক প্রশ্ন শুনতে হয়। সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। লজ্জিত বোধ করি।তখন মনে মনে বলি - ‘কীপ আস অন দ্যা স্ট্রেইট ওয়ে' : সুরা আল ফাতিহা।

বুকিত বিনতাংয়ের একেক গলির একেক রূপ। আমি হোটেলের সন্ধানে আরেক গলিতে ঢুকলাম। কিছু দূর এগোতেই দেখি এরাবিয়ান-মালয়েশিয়ান কিছু তরূণ চলন্ত গাড়ি দিয়ে একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে ক্র্যাশ করতে করতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে গাড়ি থামিয়ে সবগুলোকে নামিয়ে পিছমোড়া করে বেধে গাড়ির উপর উবু করে দাঁড়া করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। অপরাধীরা মালয়েশিয়ান পুলিশের হাতে ধরা খেলে খবর আছে। বিদেশীদের ধরলে রিংগিত ঘুষ তো নিবেই সাথে মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ, ট্যাব যা আছে সব নিবে। লোকালদের ধরলে টাকা নিবে না, বিচার হবে কড়া। আমি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে সরে পড়লাম। কখন বিদেশী দর্শক হিসেবে আমাকে ধরে পকেট হাতিয়ে নেয় কে জানে।

দু’পাশে হোটেল আর হোটেল। আলিশান হোটেল থেকে শুরু করে সস্তার হোটেলও আছে। ছোট ছোট হোটেলগুলোর অধিকাংশতেই আজ থেকে বিশ-ত্রিশ বছর আগের মালয়েশিয়ার ছায়া। প্রায় প্রতিটি হোটেলের সামনে কয়েকজন করে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় লম্বা ফিগার, হাইহিল, আর ঝলমলে চুলের মেয়েরা ঝংকার তুলে এসে বলল, ‘ইউ ওয়ান্ট মি?’ আমার জীবনে এই প্রথম স্ট্রিট গার্লদের সাথে বাস্তবে দেখা। আমি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়েই তাদের পাশ কাটিয়ে গিয়ে হোটেলের রিসেপশানে গেলাম। রিসেপশানে দুইজন ছেলে বসা। একজন পাকিস্তানি মনে হয় আমার চেহারা দেখ ভাবল আমি ইন্ডিয়ান। সে হিন্দিতে বলল,
: তুমকো এক রুম চাহিয়ে? সাথমে কোই লাড়কি চাহিয়ে? (বাক্যটা সম্ভবত: এরকম)
: নেহি।

এই কয়েকদিনে মালয়েশিয়াতে চেহারা দেখে কে কোন দেশি সেটা বোঝার আইডিয়া তৈরি হয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানির পাশের ছেলেটিকে আমি বললাম,
: ভাই, পাকিস্তানি আমাকে মেয়ে গছাতে চাচ্ছে আর আপনি বাংলাদেশি হয়ে মুখ বন্ধ করে বসে রইছেন?

বাংলাদেশি ছেলেটা হকচকিয়ে গিয়ে বলল,
: আপনি বাংলাদেশি? হিন্দিতে কথা বলতাছেন…?
: কথায় আর কী…চেহারায় দেখেন না লেখা আছে বাংলাদেশি?’
: হা-হা-হা

সে আমার কথা শুনে বলল,
: আপনি বুকিত বিনতাং ঘুরতে আসছেন। রুম ভাড়া তো অনেক পড়ব।আমার ডিউটি না থাকলে আমার সাথে গিয়ে আমার বাসায় থাকতে পারতেন। ভাই, আপনার ডিসট্রিক্ট কই…।
তারপর নানান ধরনের বাংলা প্যাঁচাল।

সিঙ্গেল রুম দেড়শ রিংগিতের নিচে হবে না। আমি বেশ কিছুক্ষণ পাকিস্তানির সাথে দড় কষাকষি করে পচাত্তর রিংগিতে রাজি করালাম। পচাত্তর রিংগিতও কম না। আড়াইশ’ রিংগিত হচ্ছে আমি যে ফ্ল্যাটে থাকি তার একরুমের এক মাসের ভাড়া। চাবি নিয়ে লবিতে ঢোকার সাথে সাথে যেন আমি প্রায় কয়েকশ’ বছর আগের কোন চাইনিজ স্থাপত্যে ঢুকে পড়লাম। লবি থেকে সরু প্যাসেজ লাল গালিচায় মোড়ানো। কাঠের সিড়ি। চারদিকে সব চাইনিজ ডিজাইন। পুরনো কিন্তু পরিষ্কার। দরজা খুলে রুমের ভিতরে ঢোকার পর আবার সবকিছু আধুনিক। এলসিডি টিভি। নরম বিছানা। ঝকঝকে বাথরুম। আর সেই ঘ্রাণ। 

সেই ঘ্রাণ বলছি এই কারণে যে, মালয়েশিয়ায় আসার পর এই এক অদ্ভুত ঘ্রাণ আমাকে মাতাল করে রেখেছে। কেউ কেউ বলেছিল এটা চাইনিজদের পূজার ধুপের ঘ্রাণ। পরে বের বের করেছি যে এটার রহস্য খুবই হাস্যকর। এই ঘ্রাণ হচ্ছে বিশেষ একটা ডিটারজেন্ট পাউডারের। ধোয়া কাপড় থেকে এই ঘ্রাণটা আসে। ঘ্রাণ রহস্য সমাধান করতে গিয়ে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি যে, অনেক কিছুই শেয়ার করা যায় কিন্তু ঘ্রাণ কী শেয়ার করা যায়? এর উত্তর লেখার শেষে বলব।

শাওয়ার নিয়ে চুল শুকানোর জন্য এয়ার কুলারের কাছে বিছানার এক পাশে বসতেই শরীর কেমন ছেড়ে দিচ্ছিল। কী নরম বিছানা। কিন্তু এখনও বাইরে, বুকিত বিনতাংয়ের অলিগলিতে কত কী অপেক্ষা করছে। আমি আরাম প্রিয় মানুষ। কৌতুহলের কাছে আরাম হার মানল। ল্যাপটপ আর সাথের মূল্যবান জিনিস পত্র রেখে আবার বেরিয়ে পড়তে হবে। আমার পাসপোর্টে লিগ্যাল ভিসা। তারপরেও মালয়েশিয়ান পুলিশের ঠিক নাই। কোন দোষ না পেলে শেষে সাথের জিনিসপত্র রেখে দিবে। রাত আড়াইটা। হোটেল ছেড়ে বেড়িয়ে পড়লাম। বের হওয়ার সময় দেখলাম রিসেপশানে বসে মুক্তিবাহিনী আর পাকবাহিনীর দুই সেনা-ই ঝিমাচ্ছে।

হোটেলের বাইরে আবার সেই রঙ্গিন দুনিয়া। বুকিত বিনতাংয়ের এক গলির শেষ মাথায় ছোট খাট চায়না টাউনের মত আছে। গলিটা নীচু থেকে উচু পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে। পুরো গলিটা আলোকসজ্জায় সজ্জিত। রাস্তার দুপাশে চাইনিজ খাবারের মোবাইল শপ। শপগুলোর চারদিকে চেয়ারে বসে চাইনিজরা ভিড় করে বসে খাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে। তাদের দেখে বোঝা মুশকিল যে তখন এত রাত। রাস্তার উপরেও আলোকসজ্জা করা হয়েছে। দুপাশে এপার্টমেন্ট আছে। সস্তা ডর্ম আছে। যেখানে সস্তায়, চল্লিশ রিংগিত দিয়ে কয়েকজন মিলে ডাবল ডেক বেডে রুম শেয়ার করে থাকা যায়।

আমি এক মোবাইল শপে বসে ‘তেও পানাসের’ অর্ডার দিলাম। মালয়েশিয়ান ভাষায় তেও মানে চা আর পানাস মানে গরম। তার মানে আমি গরম চা নিয়ে বসলাম। আমার সামনে ম্যাসেজ পার্লার। মালয়েশিয়াতে অগণিত ম্যাসাজ পার্লার আছে। ম্যাসাজ মানে মালিশ। কিন্তু এই মালিশের প্রক্রিয়া ভিন্ন। কয়েক চুমুক তেও পানাস খেতে খেতেই খেয়াল করলাম ভিনদেশিদের মধ্যে এক মধ্য বয়সী বাংলাদেশিকে মালিশ ঘরের সামনে ঘুর ঘুর করছে। এক মহিলা মালিশ ঘরের গেটের সামনে রগরগে ড্রেস পড়ে লিফলেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশী ভদ্রলোক বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে সাহস জমিয়ে, এদিক সেদিক তাকিয়ে সেই মহিলার কাছে গেল। তাদের মধ্যে যে কথাবার্তা হল দূর থেকে তেও পানাস পান করতে করতে আমি সেটা আইডিয়া করার চেষ্টা করলাম।

: তোমরা কি ম্যাসাজ কর?
: হ্যাঁ।
: তুমি নিজে কর?
: তুমি চাইলে করে দেব। কোন সমস্যা নেই। আসো।
: কত রিংগিত?
: ‘---’।
: এত রিংগিত শুধু ম্যাসাজ?
: তুমি এত ভাবছ কেন? সব ব্যবস্থা আছে। তোমার রিংগিত উসুল হয়ে যাবে।

বাংলাদেশি ভদ্রলোকের মুখে চাঁদের হাসি। অবশ্যই বাঁকা হাসি। রগরগে মহিলা তাকে হাত ধরে টানতে টানতে মালিশ ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল। আমি তেও পানাস পান করতে করতে ঘ্রাণ বিষয়ক ফিলোসফিতে মননিবেশ করলাম। আসলে ঘ্রাণ শেয়ার করা খুব সোজা। পারফিউম দিয়েই তো আমরা ঘ্রাণ শেয়ার করি। আমার এক বন্ধুকে মালয়েশিয়ার এই অদ্ভূত ঘ্রাণের কথা বলার পর সে খুব কৌতুহলী হয়ে পড়েছিল। তাকে আমি সেই ডিটারজেন্টের একটা মিনি প্যাক দেশে কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দিলাম। সে সেই পাউডার দিয়ে ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধুয়ে সেই ঘ্রাণ পেয়েছে। তারপর সেই ঘ্রাণে আমার মত আশক্ত হয়ে পড়েছে। এই কথা আমার এক চাইনিজ-মালয়েশিয়ান বন্ধু শোনার পর বলল,
: ইয়্যাক… এই ডিটারজেন্টের ঘ্রাণে তুমি আশক্ত হয়ে পড়েছ? আমার তো বমি আসে… আর এই ব্র্যান্ড-ই চেঞ্জ করে ফেলেছি।

আমার ঘুম পেতে শুরু করেছে। হোটেলের নরম বিছানা, এয়ারকনের কথা মনে পড়তেই শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। আমি প্রায় ঘুমন্ত অবস্থাতেই ছুটতে ছুটতে চললাম হোটেলের দিকে। রুমে গিয়েই বিছানায় ঝাপিয়ে পড়ব। আচ্ছা, কোন কবির অনুমতি ছাড়া কি কেউ তার কবিতা ব্যবহার করতে পারবে? ঘুমন্ত পরিব্রাজকরা বোধহয় পারবে।  

আজ এই বসন্তের রাতে
ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে;
ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,
স্কাইলাইট মাথার উপর,
আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।

বি:দ্র: ছবিটি সংগৃহিত। দুর্ভাগ্যবশত: আমার তোলা ছবিগুলো মেমরি কার্ড থেকে মুছে গিয়েছে।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Kualalampur, Malaysia, Bukit, Bintan, travel, Story, Nightlife, Star, Midnight