সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

qq.jpg

আলিসাদ্‌র গুহা বিস্ময়কর গুহা: যার ২৪ কি.মি. দীর্ঘ জলাধার মাটির নীচে

পৃথিবীর বিস্ময় ইরানের হামেদান প্রদেশে অবস্থিত আলিসাদ্‌র গুহা। পাহাড় ও আংশিক সমতল ভূমির নীচ দিয়ে বয়ে গেছে ২৪ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ নদী বা জলাধার। প্রশ্ন হচ্ছে এ জলাধারের শেষ কোথায়? প্রাচীনকালে গুহা মুখে মানুষ বাস করলেও বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগে মানুষ জানতেই পারেনি এটি এতো দীর্ঘ হবে। কি আছে রহস্যময় এ গুহায়?

ইরানের হামেদান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহরের নামও হামেদান। এই শহরের বয়স পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি। ইরানের পর্যটন ও সাংস্কৃতিক শহরের তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে হামেদান। এখানে রয়েছে বিস্ময়কর একটি গুহা যার নাম আলিসাদ্‌র গুহা

হামেদান শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে আঁকা বাঁকা লম্বা একটি পাহাড় ও সমতল ভূমির নীচে এই গুহাটি অবস্থিত। ওই এলাকার স্থানীয় লোকজন গুহাটির নাম দিয়েছে আলিসাদ্‌র

গুহাটির ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য হলো এর ভেতরে অসংখ্য লেক বা নালা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে আছে। লেকগুলো আঁকাবাঁকা। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে এই পানি কখনো সূর্যের মুখ দেখেনি। তবে লেকের পানি অসম্ভব স্বচ্ছ। পানির কোনো রং নেই, গন্ধও নেই। স্বচ্ছতার কারণে পাঁচ মিটার গভীর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। পানির স্বাদ সাধারণ মিষ্টি পানির মতোই। এর মধ্যে কোথাও কোথাও পানির গভীরতা হলো সাড়ে ছাব্বিশ ফুট। গুহার উচ্চতা কোথাও কোথাও একশো বত্রিশ ফুট।

আলিসাদ্‌র গুহার ভেতরে দেওয়ালের গায়ে রয়েছে পিওর ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের পলেস্তারা। এ ছাড়া, গুহার ছাদের দিকে তাকালে দেখা যাবে লোহার দণ্ডের মতো অসংখ্য দণ্ড পাশাপাশি ঝুলে আছে। সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় মিটারের দণ্ড ঝুলে থাকতে দেখা যায়। বলা হয় এ দণ্ডের মাত্র এক মিলিমিটার বৃদ্ধির জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখের বেশি বছর সময় লাগে এবং তা অসম্ভব শক্ত। প্রাকৃতিক উপায়ে নীচ থেকে পানি বাষ্প হয়ে উপরে উঠে তা ওই দণ্ডের মাধ্যমে চুইয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি আবারো নীচে পড়ে। লাখ লাখ বছর ধরে দণ্ডের আগায় পানির কণা জমেই এর আকার বাড়তে থাকে

গুহার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বা দৃশ্য অসম্ভব সুন্দর। বিশেষ করে রং বে রং এর লাইটিং ব্যবস্থা পরিবেশকে করে তুলেছে আরো আকর্ষণীয়। ভেতরে বিরাজ করছে একেবারে সুনসান নীরবতা।

গুহায় পানির গভীরতা সবসময় সমান থাকে না, মাঝেমধ্যে উঠানামা করে। পঞ্চাশ থেকে একশো  সেন্টিমিটার অর্থাৎ বিশ থেকে চল্লিশ ইঞ্চির মতো বাড়ে কমে। সাত কোটি বছরের প্রাচীন এই গুহাটি ১৯৬৩ সালে প্রথমবারের মতো আবিষ্কৃত হয়। হামেদানের পর্বতবাসী বা পর্বতারোহীরা এই রহস্যময় গুহাটি আবিষ্কার করেন। পাহাড়ের নীচের এই জলগুহাটির এ পর্যন্ত চব্বিশ কিলোমিটার পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। এ গুহার গভীরতা আরো কতদূর তা অনুসন্ধানের কাজ এখনো চলছে।

আলি সাদর গুহাটি সরি কিয়ে (হলুদ প্রস্তর) পাহাড়ের নীচে অবস্থিত। ১৯৬২ সালে হামেদানের পর্বতারোহীরা গুহার অল্প কিছু দূর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থা করে গণমানুষের পরিদর্শনের উপযোগী করে তোলে। ধীরে ধীরে এই গুহা বর্তমানে ইরানের অন্যতম প্রাকৃতিক ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত হয়েছে। তবে ট্যুরিস্টদের জন্য মাত্র তিন থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এর ভেতরে বেড়াতে গেলে আপনি হেটে কিংবা বোটে যেতে পারেন। প্যাডেল বোট নিজে নিজে চালাতে পারেন, তা না হলে নৌকাচালক আপনাকে নিয়ে যাবে অপার রহস্যময় এই গুহার বিচিত্র কোণে। যেদিকেই তাকাবেন শুধু বিস্ময় আর বিস্ময় আপনাকে কর্মচঞ্চল এই পৃথিবী থেকে নতুন এক পৃথিবীতে নিয়ে যাবে।

গুহার মাঝখানে আধা ঘণ্টা নৌকায় বেড়াবার পর আপনি ইচ্ছে করলে নেমে গিয়ে পায়ে হেঁটে উপরের দিকে উঠে যেতে পারেন। আনুমানিক পাঁচ শ' সিঁড়ি উপরে গেলে আপনি ইচ্ছে করলে অন্য রুটে গুহামুখের দিকে ফিরে আসতে পারেন হেঁটে। হেঁটে আসতে গেলে আনুমানিক আধাঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। এখানে যে পাঁচ শ’ ধাপ সিঁড়ির কথা বলা হচ্ছে তা আসলে আজ থেকে কয়েক কোটি বছর আগে ছাদ থেকে বিশাল একটা অংশ বা পাথর খণ্ড পানির ওপর আছড়ে পড়ে এবং তা বিশাল জায়গা নিয়ে ভাঙ্গাচোরা নানা আকারের পাথরের স্তূপে পরিণত হয়েছে। সেই ভাঙ্গা পাথর খণ্ডের স্তূপের ওপর দিয়ে এক পাশ থেকে অন্যপাশে যাওয়ার জন্যই এই ৫০০ ধাপের সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য।

গুহার মধ্যে পানির উপকূলভাগে অর্থাৎ শুকনা এলাকায় অসংখ্য অমসৃণ পাথর রয়েছে যা অনেকটা ভূমি থেকে ছাদ পর্যন্ত পিলার বা স্তম্ভের মতো কাজ করে এবং এসব স্তম্ভের ভেতর দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রচুর অলিগলি। এলোমেলো ও অনির্দিষ্ট এসব আঁকাবাঁকা গলি মাছ ধরা জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ যদি একবার এই গলি মধ্যে প্রবেশ করে তাহলে তার জন্য ফিরে আসা খুবই দুঃসাধ্য কাজ। এ কারণে এর মধ্যে লাইট ও নির্দিষ্ট রাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে কোনো পর্যটক পথ ভুলে ভেতরে হারিয়ে না যায়। 

সম্প্রতি আলিসাদ্‌র গুহার ভেতরে খনন কাজ চালিয়ে বেশকিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্রাপ্ত জিনিসপত্র থেকে প্রমাণিত হয় যে এই গুহার মুখে ও কিছুটা ভেতরের দিকে মানুষ বাস করতো। তবে আলোর অভাবে মানুষ সে সময় গুহার মুখেই বাস করত। প্রাপ্ত জিনিসপত্রগুলো হলো বড়ো কলস, প্রদীপ জ্বালাবার জন্যে ব্যবহৃত পিলসুজ, ধাতব এবং মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র।

১৯৯৪ খৃস্টাব্দে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক বিস্ময়কর এই আলীসাদ্‌র গুহার উপর গবেষণা চালিয়ে বলেছেন, এটি বিশ্বের অন্যান্য গুহার তুলনায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এবং নিশ্চিতভাবে এই গুহাটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ পানিগুহা

প্রকৃতপক্ষে, আলোর ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হওয়ায় কিংবা আধুনিক যুগে বিদ্যুৎ আবিষ্কার হওয়ার পর এ গুহার গভীরতা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগে মানুষ জানতেই পারেনি এ গুহা এত দীর্ঘ হবে।

১৯৯১ সালে আলিসাদ্‌র ট্যুরিজম কোম্পানি পুরো এলাকার উন্নয়নকাজ শুরু করে। গুহা মুখের বাইরে হোটেল, অতিথিশালা, কাঠনির্মিত ভিলা এবং তাঁবু গাড়ার মতো প্রশস্ত জায়গা অহরহ এবং সহজলভ্য। এছাড়াও আছে বিনোদনের জন্যে সিনেমা-থিয়েটার ও খেলারমাঠ। খাওয়া-দাওয়ার জন্যে আছে রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থা।

সবমিলিয়ে আলীসাদ্‌র গুহা মনোরম একটি অবকাশ যাপন কেন্দ্র হিসেবেও বিখ্যাত। এ ধরনের গুহা পৃথিবীতে খুবই বিরল। আমেরিকায় এ রকম একটি গুহা আছে কিন্তু তার নীচে পানি নেই। আরেকটি আছে ইন্দোনেশিয়ায়। তবে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পানিগুহা হিসেবে এই আলীসাদ্‌রের খ্যাতি আজও অম্লান।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

আলিসাদ্‌র, গুহা, ইরান, হামেদান, পাহাড়, নদী, জলাধার, রহস্যময়, বিস্ময়কর, ঐতিহাসিক, পর্যটন, পর্বতারোহী, ট্যুরিস্ট, পর্যটক, পানিগুহা