সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

DSCF4079.jpg

বাঙালী সংস্কৃতি উপমহাদেশের সাহিত্যতীর্থ; শান্তিনিকেতন

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে যেকোন জাতি ও ধর্মের ব্যক্তির প্রবেশ অবাধ করে দেন, যা সে সময়ের তুলনায় অভাবনীয় ছিল। তিনি সেখানে মূর্তিপূজা, মাংসভক্ষণ ও মদ্যপানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

পৃথিবীর কাছে বাঙালী সংস্কৃতি ও বাঙলা সাহিত্যকে যিনি সবার আগে তুলে ধরেছিলেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর আগমনের পর বাঙালী প্রথম বুঝেছিল, বাঙলা সাহিত্য দিয়েও বিশ্বজয় করা সম্ভব। শুধু মহাকাব্য রচনা ছাড়া শিল্প সাহিত্যের এমন কোন ধারা নেই যা তাঁর পদচারণায় পুষ্পিত হয় নি। আধুনিক বাঙলা সাহিত্য তাঁর হাতেই কৈশোর থেকে যৌবনপ্রাপ্ত হয় এবং তাতে যোগ হয় সৌন্দর্যের দীপ্তি। তিনি এতটাই উজ্জ্বল ছিলেন যে, তাঁর যুগের অন্যান্যরা জ্ঞাতসরে বা অজ্ঞাতসরে তাঁকে অনুকরণ করতে থাকেন। তাঁর প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে নতুন সাহিত্যধারা সৃষ্টির লক্ষ্যে পরবর্তীতে কল্লোল যুগের সূচনা হয়। শুধু সাহিত্য নয়, বাংলার সম্পূর্ণ সংস্কৃতিতে তিনি আনেন আমূল পরিবর্তন। বাঙলার পরতে পরতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মিশে আছেন। সেই চিরচেনা রবি ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন যেন আজও তাঁকে জীবদ্দশায় ধারণ করে আছে। এর প্রতিটি উপাদানে আছে রবীন্দ্রস্বাক্ষর, বাতাসে মিশে আছে তাঁর ঘ্রাণ। 

শান্তিনিকেতন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের নিকটে অবস্থিত, কোলকাতা শহর থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার বা ১০০ মাইল উত্তরে। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি কবির বিরূপ ধারণা থেকে ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তিনিকেতন ব্রহ্মবিদ্যালয়, যা ক্রমে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।

শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম গত ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১২, রবিবারে। পাঁচজনের দল। আমরা সেদিন সকাল সকাল কোলকাতার হাওড়া স্টেশনে চলে আসি। তারপর শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে চড়ে রওয়ানা হই। ট্রেন চলতে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা শহর পেরিয়ে যাই। শুরু হয় দিগন্তবিস্তৃত মাঠ আর ফসলি জমি। দূরে বসতিও চোখে পড়ে। কিছুদূর পর পর গরু চরতে দেখা যাচ্ছিল। বাংলার চিরন্তন শান্তিপূর্ণ গ্রামগুলোরই রূপ প্রত্যক্ষ করতে করতে এগিয়ে গেলাম। ট্রেনের ভেতর অনেক তরুণ তরুণী হৈ চৈ আর গান গাইতে গাইতে সময়টা ভালই কাটছিল। কিছুটা সময় না যেতেই ট্রেনে উঠে আসেন দুজন বাউল শিল্পী। গেরুয়া পোশাক, মাথায় লম্বা চুল, হাতে খঞ্জর, দোতারা, গলায় পুঁতির মালা। হাতের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে একের পর এক কীর্তন, বাউল গান গেয়ে যাচ্ছিলেন। আমরাও তাঁদের সাথে সুর মিলিয়ে হাতে তালি দিয়ে অংশ নিচ্ছিলাম। তাঁরা বাউল ধারার কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীতও গেয়েছিলেন।

দুপুর ১:৩০ টার দিকে আমরা বোলপুর স্টেশনে পৌঁছি। রেলস্টেশনটি খুব সাজানো গোছানো, একটি বাগানও আছে এতে। অতিসম্প্রতি স্টেশনটির সংস্কার কাজ হয়েছে। শান্তিনিকেতন এলাকার একটি বড় মানচিত্র দেখলাম। এছাড়াও আছে রবি ঠাকুরের ছবি, আঁকা ছবি, দেয়ালে আঁকা গ্রাম বাঙলার চিত্রসহ নানা ধরণের অলঙ্করণ। স্টেশনের সামনে আছে গীতাঞ্জলি ভবন। এখান থেকে শান্তিনিকেতন প্রায় ৩ কিলোমিটার। স্টেশন থেকে সেদিকে যাওয়ার পথে একটি তোরণে লেখা রবি ঠাকুরের কবিতার লাইন, 

আমাদের শান্তিনিকেতন সে যে সব হতে আপন
তার আকাশ ভরা কোলে মোদের দোলে হৃদয় দোলে
মোরা বারে বারে দেখি তারে নিত্যই নূতন।। 

স্টেশন থেকে রিক্সায় পূর্ব বরাদ্দকৃত বীরভূম গেস্ট হাউজে চলে আসি। সেখানে হাতমুখ ধুয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়ি বহুপ্রতীক্ষিত শান্তিনিকেতন দেখার জন্য।রবি ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের আদি প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আশ্রম হিসেবে একে প্রতিষ্ঠা করেন। মহর্ষি মাঝে মাঝেই ধ্যান ও আধ্যাত্মচিন্তার জন্য হিমালয়ে যেতেন। ১৮৬২ সালে তাঁর যাত্রাকালে বোলপুর থেকে রায়পুর যাওয়ার পথে এই এলাকায় তিনি বিশ্রামের জন্য বিরতি নেন। সেখানে তখন ছিল শুধু খোয়াই নদী, খোলা মাঠ আর দুটি ছাতিম গাছ। সেখানকার শান্ত সমাহিত পরিবেশ তাঁর ভাল লেগেছিল। তাই রায়পুরের জমিদার ভূবনমোহন সিংহের কাছ থেকে ছাতিম গাছসহ বিশ বিঘা জমি বার্ষিক পাঁচ টাকা খাজনায় গ্রহন করেন। এরপর ১৮৬৩ সালে তিনি একটি অতিথিশালা স্থাপন করে শান্তিনিকেতন নাম দেন। বাড়ির নাম থেকে ধীরে ধীরে এলাকাটির নাম হয়ে যায় শান্তিনিকেতন। ১৮৭৩ সালে বালক রবীন্দ্রনাথ পিতার সাথে প্রথম শান্তিনিকেতনে আসেন।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে যেকোন জাতি ও ধর্মের ব্যক্তির প্রবেশ অবাধ করে দেন, যা সে সময়ের তুলনায় অভাবনীয় ছিল। তিনি সেখানে মূর্তিপূজা, মাংসভক্ষণ ও মদ্যপানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ১৮৯১ সালে শান্তিনিকেতনের নিজস্ব উপাসনা মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।

শান্তিনিকেতন ভবন আশ্রমের সবচেয়ে পুরনো বাড়ি। এই দালান বাড়িটি শুরুতে একতলা ছিল, পরে দোতলা করা হয়। রবি ঠাকুরও এককালে একে বসতবাড়ি হিসেবে ব্যবহার হিকরেন। বর্তমানে এর ভেতর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগ্রহশালা ও জাদুঘর রয়েছে। ভবনটির সামনে রামকিঙ্কর বেইজ নির্মিত একটি বিমূর্ত ভাস্কর্য আছে – নাম অনির্বাণ শিখা। রামকিঙ্কর বেইজ ছিলেন ভারতীয় সাঁওতাল ভাস্কর। তিনি ভাস্কর্যকলায় পাশ্চাত্য শিল্প অধ্যয়ন করে তার সাথে ভারতীয় শিল্পের মিশ্রন ঘটান। ভারতীয় ভাস্কর্যশিল্পে তাঁকে আধুনিকতার জনক বলা হয়। 

১৯০১ সালে কবিগুরু শিলাইদহ থেকে শান্তিনিকেতনে স্থায়ীভাবে চলে আসেন এবং প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শে 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রথম ছাত্ররা ছিলেন কবির জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথ, কবির বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদার এবং আরও তিনটি ছেলে। শুরুতে অব্রাহ্মণ ছাত্রদের জন্য বিভেদসূচক কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও পরে অব্রাহ্মণ, অবাঙালী, অহিন্দু সবার ভেদাভেদ মুছে গিয়ে সকলে একই নিয়মের অধীনে চলে আসে।  

রবি ঠাকুর প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছাত্র শিক্ষকদের সুন্দর সম্পর্ক নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের ঘুম থেকে উঠে ঘর পরিষ্কার করে শরীরচর্চা করতে হত। এরপর স্নান ও সমবেত উপাসনা, তারপর শুরু হত ক্লাস। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি গান, নাচ, ছবি আঁকা, কাঠের কাজ, তাঁত শিক্ষা, বই বাঁধাই ইত্যাদিও শেখানো হত। ছাত্রদের মধ্যে সাহিত্যবোধ জাগানোর জন্য সাপ্তাহিক সাহিত্যসভার আয়োজন করা হত। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের রচনা পাঠ করতে পারত। প্রকৃতিচর্চা ছিল গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অনুষঙ্গ। এছাড়া শিক্ষার্থীদের আশ্রমের রাস্তা মেরামত, বাগান করা, দরিদ্রসেবাও করতে হত।

ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুতে শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়া ও শিক্ষার ব্যয়ভার রবি ঠাকুর নিজে বহন করেন। ফলে তাঁর উপর বড় ধরণের আর্থিক চাপ পড়ে। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী তাঁর সমস্ত গয়না বিক্রি করে দেন। একসময় কবি তাঁর পুরীর বাংলোবাড়ি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তাঁর নোবেল পুরষ্কারের অর্থের একাংশ এবং তাঁর লেখা গ্রন্থের আয়ও এর পেছনে ব্যয় করেন। 

স্কুলটিকে প্রতিষ্ঠার শুরুর দিক থেকেই তাঁকে অনেক নিকট স্বজনকে হারাতে হয়। ১৯০২ সালে পত্নী, ১৯০৫ সালে পিতা, ১৯০৭ সালে এগারো বছর বয়স্ক কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথকে হারান কবি। কিন্তু এর মধ্যেও তিনি শান্তিনিকেতনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। দেশ বিদেশ থেকে নানা গুণীজনকে আমন্ত্রণ করে একে তিনি জ্ঞানচর্চার একটি পীঠস্থান করে গড়ে তোলেন।

শান্তিনিকেতনে প্রবেশের সময় হাতের বামপাশে উপাসনা মন্দির পড়ে। এগিয়ে গেলে শান্তিনিকেতন ভবন। প্রতিটি ভবনের ফাঁকে ফাঁকে জমিতে বাগান করা হয়েছে। তাতে রঙ বেরঙের জানা অজানা অনেক ফুল ফুটে আছে। পুরো এলাকাটির মাঝে আছে ছাতিমতলা, যেখানে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি সবই পেয়েছিলেন। এখানে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। ছাতিম গাছটি শাল, তাল, মহুয়া দিয়ে ঘেরা। আর চারপাশ বেষ্টন করে আছে একটি মনোরম বেদী। ছাতিমতলায় প্রতিবছর মহর্ষি ও রাজা রামমোহন রায় স্মরণসভা, ৭ই পৌষের প্রার্থনাসভা ও অনুষ্ঠান হয়। 

দেখতে দেখতে আমরা একটা কুটিরের সামনে আসি। এর নাম তালধ্বজ। একটি তালগাছকে কেন্দ্র করে তাকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে ছাউনী দেওয়া মাটির ঘর। কবিগুরুর লেখা তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে এই গাছকে নিয়েই লেখা। এছাড়াও মাধবী ছাত্রী নিবাস, তিন পাহাড়, আম্রকুঞ্জ, দেহলী, নতুন বাড়ি, শালবীথি, শমীন্দ্র শিশু পাঠাগার, সিংহসদন ইত্যাদি অনেক কিছুই দেখার মত আছে। শান্তিনিকেতন দেখার প্রাথমিক পর্ব শেষ করে আমরা উত্তরায়ণ অংশটি দেখার জন্য এগিয়ে গেলাম। শান্তিনিকেতন দেখার আজন্ম কৌতুহলের কিছুটা হলেও মিটল।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

শান্তিনিকেতন, ভ্রমন, অভিজ্ঞতা, ভারত, বাংলা, মেলা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রবীন্দ্রনাথ