সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

unnamed 4.jpg

জল ছুঁই মেঘ ধরি বগা লেকের দেশে যাই

এমন সুন্দরের সাথে আলিঙ্গন হবে এমনটি কখনই ভাবি নি। হয়তো আবার দেখা হবে। হ্যাঁ আবার হবে। ঝট পট করে ছবি তুলে নেই কয়েকটা। কিন্তু চোখ দিয়ে যা দেখলাম, ক্যামেরার কি সাধ্য আছে তা ধারন করে রাখার?

অনেক দিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ
কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না।
যদি তার দেখা পেতাম,
দামের জন্য আটকাতো না
আমার নিজস্ব একটা নদী  আছে
সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে। ( সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় )

কবির মতো একটা পাহাড় কেনার শখ আমার অনেক দিনের ! অথচ আগে কখনও কাছে থেকে পাহাড় দেখাই হয় নি। তাই পাহাড় দেখার লোভেই এবার বান্দরবান যাত্রা। বান্দরবানকে অনেকে বলে থাকে পাহাড় কন্যা। দিগন্ত ছোঁয়ার স্পর্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এমন উঁচু আর দুর্গম পাহাড় দেশের আর কোথাও নেই।

আমরা যখন বান্দরবান শহর পৌঁছালাম তখনও সকাল হয় নি। ভোরের হালকা আলোয় বাসের জানালা দিয়ে তবু পাহাড় কন্যার অপূর্ব রুপ চোখে পড়ছিল। সাপের মতো এঁকেবেঁকে রাস্তার দু ধার দিয়ে সবুজ পাহাড়। মাঝে মাঝে উঁচু টিলার উপর ছোট ছোট ঘর, গিরি খাদ আর পাহাড়ি ঢলের নমুনা দেখতে দেখতেই আমরা শহরে  পৌঁছে যাই। আমাদের গন্তব্য বগা লেক। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৩০০ ফিট উপরের বগা লেকের জলে স্নান করার পথটা খুব স্বাভাবিক না।

সাঙ্গু নদী ধরে নৌকায় করে আমাদের যেতে হবে রুমা বাজার, সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বগা লেক। পাহাড়ের শান্ত মেয়ে সাঙ্গু। স্থানীয়রা একে ভারী মিষ্টি একটা নামে ডাকে, শঙ্খ। শঙ্খের দুইধার দিয়ে আদিগন্ত সবুজ পাহাড় তারই মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে শঙ্খ। পাহাড়ের বুক চিওে ঝর্ণার ঢল নেমে গেছে শঙ্খতে। দূর থেকে দেখেলে মনে হয় পাহাড় আর মেঘ যেন মিশে গেছে। নদী আর পাহাড়ের এমন গভীর মিতালী খুব একটা দেখা যায় না। শঙ্খ ধরে চললে সেই বিস্ময়কর সৌন্দর্যই চোখে পড়ে।

কিছু দূর পর পর পাহাড়ের উঁচু টিলার উপর কিছু আদিবাসী পাড়া। এমন অপার সবুজের মাঝে শত শত বছর ধরে ওরা এভাবেই বসবাস করছে।প্রকৃতির সাথে যেন তাদেও নিবিড় বোঝাপড়া। শঙ্খে জোয়ার-ভাটা হয় নিয়মিত। প্রচণ্ড রোদ্দুর। এর মাঝেই শঙ্খের বুকে মাছ ধরছিল পাহাড়ি কিশোরী। কেউ কেউ দূর থেকে এসেছে জল নিতে। ঝর্ণার স্বচ্ছ জল কাঁধে পাহাড়ি তরুনীকে প্রকৃতি ভেবে মানুষ ভুল করতেই পারে।

আমরা যখন রুমা বাজার পৌঁছে যাই ঘড়ির কাঁটায় তখন সাড়ে তিনটা। রাতে দীর্ঘ যাত্রার পর আগুন মাখা রোদে পাঁচ ঘণ্টা নৌকা ভ্রমনের পর দলের সবাই ক্লান্ত। পেটও একেবারে ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করছে। তাই হোটেলে ওঠার আগেই খাবারের দোকানের খোঁজ করা , সবচেয়ে বেশি দরকার ঠাণ্ডা পানি। অবশেষে রুমা বাজারে দলে বলে ক্ষুধা নিবারণ।

রুমা বাজারে আমরা যে হোটেলে উঠেছি তার জানালা দিয়ে পাহাড় দেখা যায়। সন্ধ্যার আলো নিভে যাওয়া মাত্র সে পাহাড় অন্ধকারে হারিয়ে যায়। রাত বাড়ার আগে আমরাও হারিয়ে যাই গভীর ঘুমে। পরদিন সকালেই আমাদের গন্তব্য বগা লেক। রুমা বাজার থেকে বগার পথ সহজ না,দূরত্ব ২১ কিলোমিটার। বর্ষা মৌসুমে রাস্তা ঠিক থাকে না। গাড়িতে করে যাওয়া যায় অল্প কিছু দূর। বাকি পথ হাঁটতে হয়। দুর্গম আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে হাঁটা সহজ কথা নয়।

অবশেষে আমাদের গাইড মিশুক একটা ল্যান্ড ক্লুজারের ব্যবস্থা করল। এটাতে করে ১১ কিলোমিটার পথ যাওয়া যাবে। এই রাস্তায় ল্যান্ড ক্লুজারে যাওয়া মানে জীবনকে একেবারে  হাতের মুঠোর নিয়ে ঘোরা। সরু পাহাড়ি পথ, উঁচু নিচু আর আঁকাবাঁকা। কোনভাবে পড়ে গেলে অন্তত দুই হাজার ফিট নিচের খাদে গিয়ে পড়তে হবে। ল্যান্ড ক্লুজারের চালক ফয়সালের হাতে কেবল স্টিয়ারিং নয়, ওর হাতে আমাদের জীবন। দু 'পাশে কেবল সবুজ আর সবুজ। একেই বুঝি বলে অন্তহীন সবুজ। সারা জীবন মিলেও এতো সবুজ দেখা হয়নি। এতোগুলো সবুজ কিভাবে যেন একসাথে বাসা বেঁধেছে এই পাহাড় কন্যার দেশে।

এদের মধ্য থেকে একটা পাহাড় কিনতে পারলে মন্দ হত না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিশ্চয় এমন একটা পাহাড় কিনতে চেয়েছিলেন, তার নদীটার বদলে।পথ ধরে হাঁটছি। মাঝে মাঝে শান্ত ঝিরির জলে পা ভেজাচ্ছি। সারা শরীরে ক্লান্তির ছাপ, তবুও অন্তহীন সবুজের মহা সমুদ্র। কিছুদূর গিয়ে ছোট্ট একটা পাহাড়ি গ্রাম শইরাতং। সেখানে একটু জিরিয়ে নেয়া। জল আর কলা ভোজন। গোটা পাহাড়ের শরীর জুড়েই অফুরন্ত কলার গাছ। তাই দোকানগুলোতে কলা বেশ সস্তা দামে পাওয়া যায়।

আমাদের শরীর আর চলছে না। এমন পাহাড়িয়া রাস্তায় হাঁটার অভিজ্ঞতা দলের কারও নেই। গাইড আশ্বাস দেয় সামনেই কমলার বাজার। কমলার বাজার থেকে মিনিট বিশেক হাঁটলেই বগা লেক। সেই শান্তনাকে পুঁজি করে তবুও নিথর দেহ হাঁটতে থাকে বগা লেকের পথে।

বগা লেকে যখন আসি তখন দুপুর। পা দুটো ততক্ষণে অবশ হয়ে গেছে তবুও একটা প্রশান্তি। এতো উঁচুতে একটা পাহাড় তার মাঝে একটা লেক। প্রকৃতি কতোই না বিচিত্র! কত বিচিত্র তার কারুকাজ।

বগা লেকে এসে লাল জিক বমের কটেজে দুপুর বেলা ডিম আর লাউ দিয়ে ভাত আজীবন মনে থাকবে। সন্ধ্যে বেলা মারমাদেও গ্রাম থেকে মুরগী ধরে এনে সেটার বারবিকিউ দিয়েই চলে আমাদের রাতের ভোজন। রাতের বগা লেকের দৃশ্য অসাধারন। স্বচ্ছ নীল আকাশ, পাশে উঁচু পাহাড়। দূর থেকে মিশুকের গলায় পাহাড়ি গান শোনা যায়। চমৎকার গলা ছেলেটার। গাইড হিসেবে কাজ করছে সেই ছোট বেলা থেকেই।

পরদিন সকালেই আমাদের কেওক্রাডং যাত্রা। অন্যরকম এক রোমাঞ্চকর অনুভতি। সে অনুভতিকে অস্বীকার করে ঘুমের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া অসাধ্য। সকালে ঘুম থেকে উঠেই লাঠি হাতে হাঁটছি কেওক্রাডং এর পথে। পাহাড়ি রাস্তায় লাঠি ফেলে ফেলে পা এগুতে হয়। সাথে জোঁকের ভয় তো আছেই সেই সাথে ভোরে এক পশলা বেশ বৃষ্টি হয়েছে। পথ ঘাট সব পিচ্ছিল। ফলে হাঁটতে হবে বেশ সাবধানে।

সাথের সঙ্গীরা বারবার এগিয়ে যাচ্ছে। খানিকটা মোটা হবার কারনে বারবার পিছনে পড়তে হচ্ছে আমাকে। পায়ে অসহ্য ব্যথা। পাহাড়ি রাস্তায় কষ্টের কোন শেষ নেই, মাঝে মাঝে মনে হয় থেমে যাই। তবে এর মাঝে দুই একটা শান্ত ঝর্ণার সাথে দেখা হলে মন্দ লাগে না। মনে হয় সব কষ্ট সার্থক। পাথরের উপর দিয়ে পাহাড় থেকে চুইয়ে পড়ছে স্বচ্ছ শীতল জল। সে জলে আমরা গা ভেজাই।

কিছুদূর এগুতেই চিংড়ি ঝর্ণা। এ পথের সবচেয়ে বড় ঝর্ণা এটা। জলের সাথে অসংখ্য চিংড়ি পাওয়া যায় বলেই এর এমন নাম। পথে চোখে পড়ে অসংখ্য জুম চাষ। উঁচু নিচু টিলার উপর চাষ হয়েছে সারি সারি আদা আর ধান।

টানা তিন ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা দারজেলিং পাড়ায় পৌঁছাই। এখানে কয়েকটা বোম পরিবারের বাস। সেখানকার এক বোম তরুণী আমাদের চা বানিয়ে দেয়। চায়ের সাথে কলা আর বিস্কুট খেয়ে আমরা আবার হাঁটা শুরু করি। এটাই আমাদের শেষ স্টপেজ। হাঁটতে হবে দ্রুত। বৃষ্টির ভয় আছে।অনেক খাড়া রাস্তা। বৃষ্টি হলেই শেষ। শরীরে কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই। তবু কেওক্রাডং ছোঁয়ার বাসনা নিয়ে এগুতে থাকি। পথ শেষ হয় না। এর মধ্যে শরীরের মধ্যে রক্ত চোষা শুরু করেছে বেশ কয়েকটা জোঁক।

ওই যে কেওক্রাডাং দেখা যায়!

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩১৭২ ফিট উপরে। চারপাশটা তাকিয়ে কেন জানি বিশ্বাস হয় না! অবিশ্বাসের চোখে তাকাতে থাকি নিচে ও চারদিকে। অদ্ভুত রকম সুন্দর, ভয়ঙ্কর রকম সুন্দর। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে মেঘ। এমন আলিঙ্গনের জন্যই বুঝি মানুষ এতো পথ পাড়ি দেয়। দুর্গম সে পথ। এমন সুন্দরের জন্য হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা যায় অনায়াসে।

কেওক্রাডাং,
তোমার এমন সুন্দরের সাথে আলিঙ্গন হবে এমনটি কখনই ভাবি নি। হয়তো আবার দেখা হবে। হ্যাঁ আবার হবে। ঝট পট করে ছবি তুলে নেই কয়েকটা । কিন্তু চোখ দিয়ে যা দেখলাম , ক্যামেরার কি সাধ্য আছে তা ধারন করে রাখার?

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

বগা-লেক, পাহাড়, ঝর্ণা, সাঙ্গু-নদী, শঙ্খ, টিলা, আদিবাসী, বোম, কটেজ, কেওক্রাডাং, সমুদ্র