সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

sonargaon1.jpg

ঘুরে আসুন নারায়ণগঞ্জের সব দর্শনীয় স্থানে

আপনার কর্মব্যস্তদিনের শেষে অথবা একদিন সময় করে বন্ধু-বান্ধব বা স্বপরিবারে ঘুরে আসতে পারেন নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন মনোরম পরিবেশ থেকে।

অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি জেলাতেই রয়েছে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। যা আমাদের দেশকে করেছে আরো সমৃদ্ধ। শত বছর ধরে লাখো পর্যটককে করেছে আকৃষ্ট। বিশ্বের বুকে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করছে। প্রকৃতির টানে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক ভীড় জমান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশে।

তাছাড়া বছরে অন্তত একটা সময় হলেও আমরা নিজেকে একটু সতেজ করতে ছুটে যাই প্রকৃতির কোলে। অনেক সময় কাজের ব্যস্ততার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্বেও যেতে পারিনা কোথাও।

পাঠক আজকে এমনই কিছু স্থানের তথ্য জানাবো যেখানে আপনি ইচ্ছা করলে শহুরে ব্যস্ততার ফাঁকেও অনায়াসেই ঘুড়ে আসতে পারবেন সেই সব দর্শনীয় স্থান থেকে। তাহলে আজকে চলুন ঘুরে আসি রাজধানীর একেবারে কোলঘেষা জেলা নারায়ণগঞ্জের কিছু দর্শনীয় স্থান থেকে।

প্রাচীন বাংলার রাজধানী পানাম নগরী:
মোঘল আমলে বাংলাদেশের রাজধানী ছিল আজকের এই সোনারগাঁও। ৪০০ বছর আগের সেই জৌলস না থাকলেও সেই সোনালী দিনের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে আজও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পানাম নগরী। সেখানে মোঘল রাজা ঈসা খাঁ’র আমলে নির্মিত কিছু প্রাসাদ আর পুরাকীর্তি এখনো আপনাকে মনে করিয়ে দিবে কতশত বছর আগেও কত সমৃদ্ধ ছিল আমাদের এই দেশ।

অযত্ন আর অবহেলার কারণে এর ঐতিহ্য হারাতে বসলেও বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এখন কিছু প্রাচীন ভবন সংরক্ষন করা হচ্ছে। এলাকাটিকে সরকার পর্যটন নগরীতে পরিণত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কি.মি. দূরত্বের এ এলাকটিতে ঘোরাফেরা করতে কোন টাকা লাগবেনা।

সোনারগাঁ জাদুঘর ও সংলগ্ন পার্ক:
পানাম নগরীর পাশেই পড়ে সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প যাদুঘর। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্বপ্নে গড়া এই লোক ও কারুশিল্প যাদুঘরে আপনি ইচ্ছা করলে হারিয়ে যেতে পারবেন শত সহস্র বছরের বাঙ্গালী ঐতিহ্যের মাঝে। পুরনো দিনের গ্রামীন ঐতিহ্য থেকে শুরু করে আগেকার আমলের রাজাদের ব্যবহৃত সব আসবাব পত্র ও যুদ্ধাস্ত্র দেখতে পারবেন সেখানে। এতে প্রবেশ ফি ১৫ টাকা।

বাংলার তাজমহল:
প্রেমের জন্য অমর হয়ে আছেন সম্রাট শাহজাহান তারা বিবির জন্য তাজমহল নির্মান করে। বিশ্বের ক’জনই আছেন সেখানে যাওয়ার অভিলাস প্রকাশ করেনা? কিন্তু যেতেই পারেন বা ক’জন? ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য সুখবর হলো আমাদের দেশেই নির্মিত হয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় তাজমহল। ঠিক সম্রাট শাহজাহানের গড়া আসল তাজমহল না হলেও আগ্রার তাজমহলের আদলেই গড়ে তোলা হয়েছে এই তাজমহলটি।

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ের পেরাবো এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহ মণি গড়ে তুলেছেন বাংলার তাজমহল। এই তাজমহল দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে সোনারগাঁওয়ের পেরাবো গ্রামে। সেখানে প্রবেশ ফি ৫০ টাকা।

রূপগঞ্জ রাজবাড়ি:
ঢাকা সিলেট মহাসড়কের মধ্যেখানেই রূপগঞ্জ। সেখানে আছে প্রায় শতবর্ষী রাজবাড়ি। অপূর্ব এই রাজবাড়ীর কারুকার্যমন্ডিত সৌন্দর্য দৃষ্টিনন্দন। জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে বিশাল আকৃতির পুকুর। প্রাচীন এ প্রাসাদটি বেশ আকর্ষণীয়। প্রায় ৯৫টি কক্ষ সংবলিত এ প্রাসাদে অতিথিশালা, নাচঘর, কাছারিঘর, আস্তাবলসহ আরো বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত। একটু সময় করে ঘুরে আসতে পারেন প্রাকৃতিক পরিবেশে সংরক্ষিত রূপগঞ্জের রাজবাড়ী থেকে। এখানে প্রবেশের জন্য কোন ফি লাগবেনা।

শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম:
সারা বিশ্বের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রাণপুরুষ শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম ও তীর্থস্থান এই জেলায়ই। জেলার বারদী ইউনিয়নে লোকনাথের আশ্রম। প্রতিবছর হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী এখানে আসেন পূন্যস্নানের জন্য। ঢাকা থেকে প্রায় ৩৫ কি.মি. দূরে এই তীর্থস্থানে ভ্রমনের জন্য যাতায়াত ভাড়া ছাড়া আপনাকে কোন খরচ করতে হবেনা। এছাড়াও এই এলাকা অর্থাৎ বারদীতে রয়েছে বাংলার বড় বাবু জ্যোতি বসুর স্মৃতি বিজরিত পৈত্রিক নিবাস।

এছাড়াও সোনারগাঁওয়েই রয়েছে মোঘল সম্রাট গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ্ এর মাজার। পাঁচ পীরের মাজার, লালপুরি শাহ্ এর দরবার শরিফ প্রমুখ ঐতিহ্যবাহী স্থান।

হাজীগঞ্জ দূর্গ: 
নারায়ণগঞ্জ জেলাশহরের কিল্লারপুলে অবস্থিত ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ দুর্গ। বাংলার বারভূঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁর কেল্লা হিসেবেও অনেকের কাছে এটি পরিচিত। নদীপথে মগ ও পর্তুগিজদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য মীরজুমলার শাসনামলে এ দুর্গ নির্মিত বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। চতুর্ভুজাকৃতি এই দুর্গের প্রাচীরে রয়েছে বন্দুক বসিয়ে গুলি চালাবার ফোকর।

সোনাকান্দা দুর্গ:
শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরে অবস্থিত এ জলদুর্গটি। হাজীগঞ্জ দুর্গের প্রায় বিপরীত দিকেই এর অবস্থান। নদীপথে ঢাকার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নদীপথগুলোর নিরাপত্তার জন্য মুঘল শাসকগণ কতগুলো জলদুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সোনাকান্দা দুর্গ।

বিবি মরিয়ম মসজিদ ও সমাধি:
নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত এ মসজিদটি হাজীগঞ্জ মসজিদ নামেও পরিচিতি। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি শায়েস্তা খাঁ কর্তৃক ১৬৬৪-১৬৮৮ সালে নির্মিত বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন।

কদমরসুল দরগা:
নারায়ণগঞ্জ শহরের বিপরীত দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে নবীগঞ্জে অবস্থিত কদমরসুল দরগা। এখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কদম মোবারকের ছাপ সংবলিত একটি পাথর রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট অকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান নেতা মাসুম খান কাবুলি পদচিহ্ন সংবলিত এ পাথরটি একজন আরব বণিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। ঢাকার জমিদার গোলাম নবী ১৭৭৭-১৭৭৮ সালে এ সৌধটি নির্মাণ করেন। আর কদম রসুল দরগার প্রধান ফটকটি গোলাম নবীর ছেলে গোলাম মুহাম্মদ ১৮০৫-১৮০৬ সালে নির্মাণ করেন।

রূপগঞ্জ জামদানি পল্লি:
প্রাচীন আমলে বাংলার মসলীনের কদর ছিল বিশ্ব জুড়ে। তবে আজ সেই ঐতিহ্যবাহী মসলীন না থাকলেও রয়েছে জামদানী। বিশ্বের অন্যতম আকর্ষনীয় এ শাড়ী তৈরীতে শীতলক্ষার তীরে রূপগঞ্জ থানার রূপসীতে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় জামদানী পল্লি। রূপসী বাজার ও এর আশপাশে শতশত জামদানি শিল্পী দিন-রাত তাঁতে বুনেন নানা রকম শৈল্পিক জামদানি। তুলনামূলক কম দামে এখান থেকে ভালো মানের জামদনি শাড়ি কেনা যায়।

রাসেল পার্ক:
মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির পাশেই বেসরকারি একটি বনভোজন কেন্দ্র রাসেল পার্ক। নানারকম গাছ-গাছালি ছাড়াও এখানে আছে ছোট একটি চিড়িয়াখানা। সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এটি।

জিন্দাপার্ক:
বর্তমানে রাজউকের বর্ধিত সম্প্রসারিত এলাকা পূর্বাচল উপশহরে অবস্থিত এই পার্কটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ও পরিবেশে তৈরী এই পার্কটি আগামীর ঢাকার বৃহৎ বিনোদন কেন্দ্র। গাছগাছালিতে মুখরিত এই জায়গাটিতে ইচ্ছে করলেই ঘুরে আসতে পারেন।

নারায়ণগঞ্জের পরিভ্রমনকারি নদী সমূহ হচ্ছে শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা, বালু এবং ধলেশ্বরী নদী। এসব নদীতে নৌকায় করে ঘুরে বেড়িয়ে আন্দন্দের সময় পার করতে পারেন।

যেভাবে যাবেন: 
সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে অথবা গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জের সর্বত্র যাতায়াতের জন্য লোকাল ও স্পেশাল বাস আছে। ভাড়াও হাতের নাগালে মাত্র ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০ টাকা পর্যন্ত।

পাঠক আপনার কর্মব্যস্তদিনের শেষে অথবা একদিন সময় করে বন্ধু-বান্ধব বা স্বপরিবারে ঘুরে আসতে পারেন নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন মনোরম পরিবেশ থেকে।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

নারায়নগঞ্জ, দর্শনীয়-স্থান, পানাম-নগরী, সোনারগাঁ-জাদুঘর, বাংলার-তাজমহল, রূপগঞ্জ-রাজবাড়ি, হাজীগঞ্জ-দূর্গ, সোনাকান্দা-দুর্গ, রূপগঞ্জ-জামদানি-পল্লি